bntv24
১৭ জুন ২০২৬, ৪:৪৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

সময়ের জনপ্রিয় দেশি খেজুর এখন পাখির খাদ্য

শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা):

কৃষিনির্ভর ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সড়কের পাশে, বাড়ির আঙিনায়, ফসলি জমির আইলে, পুকুরপাড়ে কিংবা পতিত জমিতে সারি সারি দেশি খেজুর গাছের দেখা মেলে। এসব গাছে থোকায় থোকায় খেজুর ধরলেও বর্তমানে মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় অধিকাংশ গাছের ফল নষ্ট হচ্ছে। এক সময় এই দেশি খেজুর হাটে-বাজারে বেশ বিক্রি হতো। তবে বর্তমান সময়ে দেশি খেজুরে ক্রেতাদের আগ্রহ না থাকায় থোকায় থোকায় গাছেই পচে নষ্ট হচ্ছে এই ফল।স্থানীয়দের মতে, প্রায় এক দশক আগেও দেশি খেজুরের আলাদা কদর ছিল। বাজারে এসব খেজুর বিক্রি হতো এবং অনেকেই লবণ মিশিয়ে কয়েক দিন রেখে পাকিয়ে খেতেন। মুখরোচক এই ফলটি তখন গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। এখন এসব খেজুর মূলত পাখির খাদ্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।সোমবার স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খেজুর গাছে থোকায় থোকায় ফল দুলতে দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। অথচ বর্তমান অধিকাংশ খেজুর গাছের ফল নষ্ট হচ্ছে। একসময় মানুষ আগ্রহ নিয়ে এসব খেজুর সংগ্রহ করে খেতেন। এ ছাড়া এসব গাছে কোনো কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না এবং বিশেষ যত্ন ছাড়াই ভালো ফলন পাওয়া যায়।টিপনা গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার গাজী বলেন,”বর্তমানে দেশি খেজুর মূলত পশুপাখির খাবারে পরিণত হয়েছে। মানুষ এখন খুব একটা খায় না। অথচ এই খেজুর এক সময় আমি বাজার থেকে কিনে এনে খেয়েছি। তবে সময়ের ব্যবধানে আজ তা হারাতে বসেছে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির প্রতিটি ফলেরই কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। এই ফল খাওয়ার অভ্যাস আমাদের বাড়ানো উচিত।”খানজাহান আলী বলেন,”আমরা বাল্যকালে যে সকল ফল দেখেছি ও খেয়েছি, তার মধ্যে অনেকগুলোই এখন আর দেখা মেলে না। ছোটবেলায় গাছ থেকে পেড়ে অনেক খেজুর খেয়েছি। তখন কলসিতে লবণ-পানিতে দুই-তিন দিন রেখে খেজুর পাকিয়ে খাওয়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু এখনকার প্রজন্মের মধ্যে সেই আগ্রহ আর দেখা যায় না। আমরা আমাদের অনেক দেশি ফল খাওয়া ভুলে গিয়েছি, যার ফলে আমরা শারীরিকভাবেও অনেক দুর্বল হয়ে পড়ছি।”মতলেব মোল্লা,‌সামাদ গাজী, শহিদুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, আগে ছোট-বড় সবাই দেশি খেজুর খেত। এখন আর তেমন কাউকে খেতে দেখা যায় না। কারণ এখন হাতের নাগালেই বিভিন্ন মানের বিদেশি খেজুর পাওয়া যায়। আবার সেগুলো দেশি খেজুরের চেয়ে আকারেও বড়। দেশি খেজুরের আঁটি বড় হওয়ায় শাঁস তুলনামূলক কম। তবে এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে একসময় এর কদর ছিল অপরিসীম।খেজুরের গুড় বিক্রেতা অরুণ ধাবক বলেন,”আমি প্রায় তিন শতাধিক গাছ থেকে শীতের মৌসুমে রস সংগ্রহ করে গুড় বানাই। আর বর্তমান সময়ে প্রতিটি গাছেই থোকায় থোকায় কাঁচা-পাকা খেজুর ঝুলছে। অথচ আমি এই খেজুর একটাও পাড়ি না। সব গাছের ফল পাখির খাদ্য হিসেবে রেখে দিয়েছি। প্রতিদিন শত শত পাখি এই খেজুর খেতে আসে। বিশেষ করে শালিক, বুলবুলিসহ অনেক পাখি আসে। তাদের কিচিরমিচির শুনতে খুব ভালো লাগে।”মো. মতিয়র রহমান বলেন, খেজুরসহ দেশি মৌসুমি সবগুলো ফলই স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। এসব ফলে প্রচুর পুষ্টিগুণ রয়েছে এবং কোনো ক্ষতিকর দিক নেই। এই দেশি ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। প্রতিটি মৌসুমি ফলই এক একটি ভিটামিনের ভাণ্ডার।ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. নাজমুল হুদা বলেন,”দেশি খেজুর আমাদের ঐতিহ্যের একটা বড় অংশ। বিদেশি খেজুরের চেয়ে এর পুষ্টিগুণ কোনো অংশে কম নয়, বরং এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বাণিজ্যিক প্রচারের অভাব এবং বিদেশি খেজুরের সহজলভ্যতার কারণে মানুষ দেশি খেজুরের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। আমরা কৃষকদের এই দেশি ফলদ বৃক্ষ সংরক্ষণের পরামর্শ দিচ্ছি। একই সাথে বর্তমান প্রজন্মের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এই ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু দেশি ফল খাওয়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা জরুরি।”এব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলাম বলেনদেশি ফলের ঐতিহ্য ও পুষ্টিগুণ রক্ষা করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। বিশেষ করে দেশি খেজুরের মতো সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু চাষাবাদ বাড়ালেই হবে না, বরং এর সুফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর স্থানীয় জাতের ফলদ বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণের জন্য মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই প্রাকৃতিক পুষ্টির উৎস থেকে বঞ্চিত না হয়।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাকরিতে মেধার দরকার নেই, এখন বিএনপির পদ থাকাই যোগ্যতা: গোলাম পরওয়ার

বিএনপি নেতাকে’ নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ জাতির সঙ্গে প্রতারণা: জামায়াত

দিল্লি পুলিশের নির্দেশেই ছাত্রদের ওপর চালানো হয় গুলি, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

মাদককারবারির তথ্য দিলে ৫ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা এমপি মাসুদের

সরকারি নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ রাশেদ প্রধানের

এনসিপির পদযাত্রায় হামলা, সারজিস ও পাটওয়ারী আহত

যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্যের মেয়ে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত

সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে খুলনাকে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলা হবে : কেসিসি প্রশাসক

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য বাকৃবির অধ্যাপক আসাদুজ্জামান সরকার

ঈদগাঁও-মাছুয়াখালী প্রধান যাতাযাতের সড়কটি খানাখন্দকে ভরপুর, দেখার কেউ নেই 

১০

রামুতে ট্রাক ও সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ৩

১১

জালালাবাদের লেবেল ক্রসিংয়ের বেরিয়াল নষ্ট, পারাপার ঝুঁকিতে জনও যানবাহন 

১২

বটিয়াঘাটা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা ও পরিদর্শন করেন খুলনা – আমির এজাজ খান

১৩

দীর্ঘকাল পর ঈদগাঁওতে নতুন ফায়ার স্টেশনের স্থাপন প্রক্রিয়া শুরু

১৪

বটিয়াঘাটা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে জাতীয় সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খানকে গণ সংবর্ধনা :

১৫

ভিয়েতনামী খাটো জাতের নারকেল চাষে ডুমুরিয়ায় বিপ্লব: আড়াই বছরেই ফলন, বছরে মিলছে ৩৫০ নারকেল

১৬

মাছের ক্ষতরোগে বাড়ছে ঝুঁকি, সচেতনতায় কমানো সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি

১৭

ঈদগাঁওতে নজরুল বর্ষ পালন উপলক্ষে প্রতি যোগিতা করলো উপজেলা প্রশাসন

১৮

জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ জেলা প্রশাসক মিজ্ হুরে জান্নাতের ‎

১৯

কেশবপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা 

২০