শেখ মোঃ আব্দুল হামিদ:
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চললেও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল বা সংশোধনের দাবি বারবার সামনে আসে। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ভূমিকা রেখে আসছেন অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসা, যিনি মনে করেন—একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং প্রাণবন্ত সংসদ প্রতিষ্ঠার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদের পুনর্বিবেচনা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে, যখন দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার বিভিন্ন সংগ্রাম জোরদার হচ্ছিল, তখনই অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসা উপলব্ধি করেন যে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদের কারণে কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা দল ত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়।
তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রধান দায়বদ্ধতা হওয়া উচিত জনগণের প্রতি। তাই তাদের এমন সাংবিধানিক স্বাধীনতা থাকা উচিত, যাতে তারা জাতীয় স্বার্থ, নিজের বিবেক এবং এলাকার জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংসদে মতামত ও ভোট প্রদান করতে পারেন।
এই ভাবনা থেকেই তিনি ৯০-এর দশকে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আইনজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। সে সময় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দেন। ফলে এ নিয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয়।
পরবর্তীতে মানবাধিকার ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যু—যেমন প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার আন্দোলন, প্রবাসী সুরত হত্যা প্রতিবাদ, টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী আন্দোলনসহ নানা কার্যক্রমে তিনি যুক্ত থাকায় ৭০ ধারা সংস্কার আন্দোলন কিছুটা ধীর হয়ে যায়। তবে এটি কখনো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি; বরং নীতিগত ও চিন্তাগত পর্যায়ে তা অব্যাহত থাকে।
বর্তমানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুনরায় সক্রিয় হওয়ায় তিনি আবারও ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে জাতীয় আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য বিভিন্ন প্রিন্ট, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
তার মতে, স্থিতিশীল সরকার যেমন জরুরি, তেমনি কার্যকর সংসদও অপরিহার্য। সংসদ যদি কেবল দলীয় সিদ্ধান্ত অনুমোদনের মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে প্রকৃত গণতন্ত্র ব্যাহত হয়। তাই এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাংবিধানিক কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে সরকার স্থিতিশীল থাকবে, কিন্তু সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে যুক্তিনির্ভর মত প্রকাশ করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে একটি নতুন জাতীয় সংলাপ শুরু হওয়া উচিত, যেখানে রাজনৈতিক দল, আইন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে। এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
তার ভাষায়,
“গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি হলো স্বাধীন মতপ্রকাশ, জবাবদিহিতা, যুক্তিভিত্তিক বিতর্ক এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে সংসদে তুলে ধরার সুযোগ।”
সংবিধানের ৭০ ধারা বাতিল বা সংস্কারের প্রশ্নে অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসার এই দীর্ঘদিনের অবস্থান কেবল একটি সাংবিধানিক পরিবর্তনের দাবি নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও আধুনিক, অংশগ্রহণমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক করার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।
এম এ রউফ (কাতার)
সদস্য সচিব, কেন্দ্রীয় কমিটি
ইমেইল: roufnasrin@gmail.com
মোবাইল: +974
মন্তব্য করুন