জি. এম. ফিরোজ, ডুমুরিয়া
সরকারি অর্থে নির্মিত হচ্ছে কোটি টাকার অবকাঠামো। ব্রিজের কাজ প্রায় শেষ। অথচ সেই সরকারি ব্রিজের গা ঘেঁষেই এক ব্যক্তির পাকা স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা—এ যেন সরকারি জায়গার ওপর ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের প্রকাশ! প্রশ্ন উঠছে, সওজের জায়গা হলে সেখানে একজন ব্যক্তি কীভাবে প্রকাশ্যে পাকা পিলার তুলে দোকানঘর নির্মাণের সাহস পান? আর প্রশাসন-সওজের চোখের সামনে এমন কাজ চলার নেপথ্যে কার প্রভাব রয়েছে?খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার হাসানপুর খেয়াঘাট ব্রিজ ঘিরে এমনই একাধিক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। ব্রিজের উত্তর-পশ্চিম পাশে স্থানীয় রেজা খান নামে এক ব্যক্তি পাকা পিলার নির্মাণ করে দোকানঘর তৈরির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ব্রিজ নির্মাণের সময় থেকেই জমি নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি করে আসছেন তিনি। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—ব্রিজ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মোট চার লাখ টাকা নেওয়ার পরও তিনি একই জায়গায় নতুন করে জমির দাবি করছেন।টাকা নেওয়ার পরও কেন জমির দাবি?স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিজ নির্মাণের শুরু থেকেই জমির সীমানা নিয়ে রেজা খানের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। একাধিকবার জায়গা মাপজোক করা হলেও তাঁর দাবিকৃত স্থানে পর্যাপ্ত জমি পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয়দের দাবি। এরপরও ব্রিজের একেবারে গা ঘেঁষে পাকা পিলার নির্মাণের উদ্যোগে প্রশ্ন উঠেছে—যদি জায়গাটি তাঁরই হয়, তাহলে সরকারি ব্রিজ নির্মাণের সময় বিষয়টি নিষ্পত্তি হলো না কেন? আর যদি সরকারি জায়গা হয়, তাহলে সেখানে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি পেলেন কীভাবে?সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল হক জানিয়েছেন, রেজা খান ব্রিজ নির্মাণে বাধা দিয়ে প্রথমে তিন লাখ টাকা দাবি করেন। পরে আরও এক লাখ টাকা দাবি করলে সেটিও দেওয়া হয়। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী মোট চার লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এরপরও ব্রিজের গা ঘেঁষে পাকা পিলার নির্মাণের ঘটনায় তিনি পিলার ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা এবং ব্রিজের ক্ষতি হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।তাহলে প্রশ্ন আরও বড়—চার লাখ টাকা গেল কোথায়, কেনই বা দেওয়া হলো?সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ব্যক্তিকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে অর্থ দেওয়া হয়ে থাকলে তার আইনি ভিত্তি, অর্থ প্রদানের নথি, মাপজোকের কাগজপত্র এবং জমির প্রকৃত মালিকানা—সবই এখন জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ সরকারি প্রকল্পের কাজে ব্যক্তিগত দাবির নিষ্পত্তি কী প্রক্রিয়ায় হয়েছে, সেটিই এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়।স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রিজের বেইজ ও গাইডের গা ঘেঁষে পিলার নির্মাণ করা হচ্ছে। এমন স্থাপনা ভবিষ্যতে ব্রিজের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।অন্যদিকে রেজা খান দাবি করেছেন, তাঁর ৩.৮৮ পয়েন্ট জমির মধ্যে ব্রিজের জন্য ১.৪৮ পয়েন্ট জমি দেওয়া হয়েছে এবং বাকি জমি তাঁর রয়েছে। তাঁর দাবি, সেই জমির ওপরই তিনি স্থাপনা নির্মাণ করছেন। তবে ৩ নম্বর রুদাঘরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাস্টার মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, একাধিক আমিন দিয়ে জায়গা মাপা হয়েছে; রেজা খানের অল্প কিছু জমি থাকলেও সেখানে ঘর নির্মাণের মতো জায়গা নেই।নেপথ্যে কার শক্তি?একজন সাধারণ ব্যক্তি যদি সত্যিই সরকারি সড়ক ও ব্রিজের সীমানার ভেতরে পাকা স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর এই সাহসের উৎস কোথায়—এ প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।তিনি কি প্রকৃত জমির মালিক?নাকি সরকারি জায়গা দখলের চেষ্টা?চার লাখ টাকা দেওয়ার দাবির পেছনে কী নথি আছে?জায়গা মাপার পরও কেন বিরোধ শেষ হয়নি?আর প্রশাসন ও সওজের তদারকির মধ্যেই পাকা পিলার ওঠার সুযোগ পেলেন কীভাবে?এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন সরকারি নকশা, সওজের জমির রেকর্ড, মাপজোকের প্রতিবেদন, অর্থ প্রদানের নথি ও সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড যাচাই।হাসানপুর খেয়াঘাট ব্রিজ কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের অর্থে নির্মিত সরকারি অবকাঠামো। তাই ব্রিজের সীমানা ও সরকারি জমি নিয়ে কোনো অনিয়ম, প্রভাব খাটানো বা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিভিত্তিক সত্য উদঘাটন এখন সময়ের দাবি।কারণ প্রশ্ন শুধু একটি পাকা ঘরের নয়—প্রশ্ন হলো, সরকারি সম্পত্তির পাশে একজন ব্যক্তি এতটা ‘কুটির জোর’ পেলেন কোথা থেকে?
মন্তব্য করুন