ডুমুরিয়া প্রতিনিধি:শেখ মাহতাব হোসেন
ডুমুরিয়া (খুলনা) সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভোর হতেই খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের ছোটবন্দ গ্রামের ফসলি জমিতে এখন চোখে পড়ে এক অপরূপ দৃশ্য। সবুজের মাঝে দুলছে সোনালি রঙের তরমুজ। ডুমুরিয়া উপজেলাজুড়ে এবার নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন কৃষক পরিবার মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল ও তার স্ত্রী কৃষাণি মিতালী মণ্ডল। মাত্র ১০ শতক জমিতে উচ্চমূল্যের বিদেশি জাতের ‘রঙিন তরমুজ’ চাষ করে বিপুল আর্থিক সাফল্য অর্জন করেছেন তারা। সাধারণ তরমুজের চেয়ে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হওয়ায় এলাকায় কৃষকদের মাঝে রঙিন তরমুজ চাষের ব্যাপক সাড়া পড়েছে। মাত্র ৬৫০০ টাকা খরচে ৩৫ হাজারের বেশি আয়। কৃষাণি মিতালী মণ্ডল জানান, ১০ শতক জমিতে বীজ কেনা, জমি প্রস্তুত, সার-কীটনাশক এবং পরিচর্যা বাবদ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৬,৫০০ টাকা। অথচ ইতিমধ্যে তিনি বাজারে ৩৫,০০০ টাকার রঙিন তরমুজ বিক্রি করে ফেলেছেন। এখনও ক্ষেতে যে পরিমাণ তরমুজ অবশিষ্ট আছে, তা থেকে আরও প্রায় ১০,০০০ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি। বাজারে সাধারণ তরমুজের তুলনায় এর কদর বেশি হওয়ায় প্রতি কেজি তরমুজ প্রায় ৭০ টাকা দরে বিক্রি করছেন, যা অন্য তরমুজের দামের প্রায় দ্বিগুণ। কৃষাণি মিতালী মণ্ডল (রঙিন তরমুজ চাষী): “প্রথমে একটু ভয় ছিল বাজারে কেমন দাম পাব। কিন্তু ফলন আসার পর দেখেছি বাজারের চিত্র পুরো আলাদা। এই জাতের তরমুজ দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি খেতেও বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু। আমরা এবার মূলত ‘তৃপ্তি’ জাতের তরমুজ চাষ করেছি। এর মধ্যে দুই ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে—কোনোটির বাইরে সোনালি হলুদ কিন্তু ভেতরে লাল, আবার কোনোটি বাইরে ও ভেতরে উভয় দিকেই হলুদ। নিজে স্বাবলম্বী হয়ে খুব আনন্দ লাগছে।”
মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল (কৃষাণির স্বামী): “আমার স্ত্রী অত্যন্ত পরিশ্রম করে এই ক্ষেতের পরিচর্যা করেছে। মাত্র অল্প খরচে এত কম সময়ে এত ভালো লাভ এর আগে আমরা দেখিনি। স্থানীয় অনেক কৃষকই প্রতিদিন আমাদের ক্ষেত দেখতে আসছেন এবং আগামী মৌসুমে এটি চাষ করার জন্য পরামর্শ নিচ্ছেন। সঠিক সরকারি সহায়তা ও বীজের সহজলভ্যতা পেলে এই অঞ্চলে রঙিন তরমুজের চাষ অনেক বৃদ্ধি পাবে।”
কৃষিবিদ মোঃ নাজমুল হুদা (উপজেলা কৃষি অফিসার, ডুমুরিয়া): “মিতালী মণ্ডলের এই উদ্যোগ ডুমুরিয়ার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রঙিন তরমুজ উচ্চমূল্যের একটি ফসল (High-Value Crop)। সাধারণ তরমুজের মৌসুম শেষ হওয়ার পরপরই অফ-সিজনে এটি বাজারে আনা যায় বলে কৃষকরা দ্বিগুণ দাম পান। উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে আমরা মিতালী মণ্ডলকে সার্বিক কারিগরি পরামর্শ দিয়েছি এবং ভবিষ্যতে এলাকার অন্য কৃষকদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।”মোঃ নজরুল ইসলাম (উপ-পরিচালক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা): “জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দানাদার শস্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ফল ও সবজি চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খুলনার মাটিতে রঙিন তরমুজের এমন বাম্পার ফলন প্রমাণ করে এই মাটি তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী। এটি শুধুমাত্র কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়াবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখবে। জেলাজুড়ে এই প্রদর্শনী সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।”মিজ সবিতা সরকার (উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ডুমুরিয়া): “উপজেলার ছোটবন্দ গ্রামের মিতালী মণ্ডলের এই সাফল্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। একজন নারী কৃষক হিসেবে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করে তিনি নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যমী নারী কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও বাজারজাতকরণে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করা হবে, যাতে গ্রামীণ নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন।”মিতালী মণ্ডলের এই সফলতা দেখে ছোটবন্দ গ্রামসহ ডুমুরিয়া উপজেলার বহু কৃষক আগামী মৌসুমে রঙিন তরমুজ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে বাজারজাতকরণ ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে খুলনার ডুমুরিয়া খুব শীঘ্রই দেশের রঙিন তরমুজ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান হাবে পরিণত হতে পারে।
মন্তব্য করুন