ডুমুরিয়া,নিজস্ব প্রতিনিধি জি. এম. ফিরোজ
খাল-বিল, নদী-নালা আর পুকুরজুড়ে কচুরিপানার দখল—দেখলে মনে হয় পানির বুকজুড়ে তৈরি হয়েছে একেকটি ‘ভুতুড়ে বাগান’। কোথাও ডিঙ্গি নৌকা চলার পথ বন্ধ, কোথাও কৃষকের মাঠে যাওয়ার রাস্তা আটকে গেছে। এরই মধ্যে ঘন কচুরিপানার আড়ালে মশার উৎপাত বেড়ে গ্রামাঞ্চলে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শুধু গ্রাম নয়, ডেঙ্গু জ্বরসহ মশাবাহিত রোগে শহরের বিভিন্ন ক্লিনিকেও রোগী ভর্তি হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিল ডাকাতিয়া, সিঙ্গার বিল, ওলার বিল, বরুনা বিল, কাটেংগার বিল, গুটুদিয়া বিল, কমলপুর বিল, খড়িয়া বিল, মাধবকাটি, বিলপাটেলা, থুকড়া, শাহপুর, মধুগ্রাম ও বিল পাবলাসহ বিভিন্ন খাল-বিল কচুরিপানায় প্রায় বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ এসব জলাশয় পরিষ্কারে ব্যবহারের জন্য সরকারি উদ্যোগে কেনা কচুরিপানা কাটার মেশিনটি কোথায়—এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে এলাকাবাসীর মুখে।স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, কচুরিপানার ভয়াবহতা বিবেচনা করে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলামিনের সময় প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কচুরিপানা কাটার মেশিন কেনা হয়েছিল। বিল ডাকাতিয়ার কচুরিপানা পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে মেশিনটি প্রথমে শোভনা গেটের সামনে নামানো হয়। কিন্তু মেশিনটি ঠিকমতো কাজ না করায় পরে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।২ নং রঘুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোজিৎ বালা ও ১২ নং রংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ সমরেশ মন্ডল বলেন, বিল ডাকাতিয়ার কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য সাবেক ইউএনও স্যার আলামিনের সঙ্গে কথা বলে মেশিনটি আনা হয়েছিল। প্রথমে (২০২৫সালে আগস্ট মাসে) শলুয়া সুইচগেটের সামনে কচুরিপানা কাটার কাজ উদ্বোধন করা হয়, কিন্তু মেশিনে সমস্যা দেখা দেয়।এরপর মেশিনটি একদিন ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়ন মেম্বার মোঃ লুৎফার মোড়ল নিয়ে যায়।ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. লুৎফর মোড়ল বলেন, তিনি মেশিনটি সাজিয়াড়ার ঘাটে বেঁধে রেখেছিলেন কচুরিপানা কাটার জন্য। কিন্তু হঠাৎ করে শাহপুরের এনসিপি সমন্বয়ক মামুন সাবেক ইউএনও স্যার আলামিনের কথা বলে তার কাছ থেকে মেশিনটি নিয়ে যান।এনসিপির সমন্বয়ক নায়ক মামুন বলেন, সাবেক ইউএনও স্যার আলামিন তাকে মেশিনটি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সুন্দলী বাজারে মেরামতের জন্য দিতে বলেছিলেন। এরপর মেশিনটির বিষয়ে আর তিনি কিছু জানেন না।কিন্তু এখানেই শেষ নয়। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সুন্দলী নতুন বাজারের কুচলিয়া পিকেবি কৃষি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের প্রদীপ বিশ্বাসের কাছে মিলেছে মেশিনটির সন্ধান। তিনি বলেন, ডুমুরিয়ার কচুরিপানা কাটার জন্য মেশিনটি সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল আমিন সাহেব আমাকে ৫ লক্ষ টাকা মূল্য অর্ডার করেন তাই তিনি মেশিনটি তৈরি বিক্রি করেন ডেলিভারিও দিয়েছিলেন। পরে অনেক দিন পর হঠাৎ করে তার অনুমতি ছাড়াই একটি ট্রাকে করে মেশিনটি তার ওয়ার্কশপের সামনে রেখে যাওয়া হয়। প্রায় দুই মাস বেওয়ারিশ হিসেবে পড়ে আছে। প্রদীপ বিশ্বাসের ভাষ্য, “মেশিনটির ব্যাটারি নেই, ইঞ্জিনের অনেক যন্ত্রাংশ নেই। বর্তমানে ভাঙারি অবস্থায় পড়ে আছে। এমনকি এর মালিককেও খুঁজে পাচ্ছি না।”এদিকে এলাকাবাসীর প্রশ্ন—উপজেলা থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা মেশিনটি যদি সত্যিই পাঁচ লাখ টাকার মেশিন হয়ে থাকে, তাহলে বাকি টাকার হিসাব কোথায়? আর সরকারি মেশিনই যদি হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘদিন একটি ওয়ার্কশপের সামনে ভাঙারি অবস্থায় পড়ে থাকার কারণ কী?সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে মেশিন দিয়ে ডুমুরিয়ার হাজার হাজার মানুষের জলাবদ্ধতা ও কচুরিপানার দুর্ভোগ কমানোর কথা ছিল, সেটিই যদি বছরের পর বছর মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে এর সুফল পাবে কে?বর্তমান ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, কচুরিপানা কাটার মেশিনটি ৩/৪ দিনের মধ্যে ডুমুরিয়ায় আনা হবে। মেশিনটি তাদের হেফাজতেই আছে। তবে মেশিনটির ক্রয়মূল্য কত জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান।এমন বক্তব্যে আরও ঘনীভূত হয়েছে রহস্য। মেশিন যদি সরকারি হেফাজতেই থাকে, তাহলে যশোরের একটি ওয়ার্কশপে ভাঙারি অবস্থায় পড়ে থাকা মেশিনটি কার? আর প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা মেশিনের প্রকৃত ক্রয়মূল্য ও বর্তমান অবস্থার হিসাবই বা কোথায়?কচুরিপানায় আটকে থাকা ডুমুরিয়ার খাল-বিলের সঙ্গে এখন যেন আটকে আছে একটি সরকারি মেশিনেরও হিসাব। দ্রুত মেশিনটির প্রকৃত অবস্থান, ক্রয়মূল্য, মেরামত ব্যয় এবং ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে কচুরিপানা পরিষ্কার করে নৌ-চলাচল ও কৃষকের চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি উঠেছে জোরালোভাবে।
মন্তব্য করুন