জি. এম. ফিরোজ, ডুমুরিয়া:
জালে টান পড়তেই জেলেদের মনে হলো—বড় কোনো মাছ উঠেছে। জাল টেনে তুলতেই দেখা গেল বিশাল আকৃতির ব্লাক কার্প। ওজন করে মিলল ২০ কেজি ৩০০ গ্রাম। ডুমুরিয়ার সিঙ্গার বিলে ধরা পড়া এই বিশাল মাছটি দেখতে মুহূর্তেই ভিড় জমে যায় স্থানীয়দের। পরে মাছটি প্রতি কেজি ৬৪০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
মাছটি ধরেছেন আঙ্গারদোহার জেলে নিজাম মোল্লা। তার জালে এত বড় ব্লাক কার্প ধরা পড়ায় শুধু তিনি নন, আনন্দিত স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষও।স্থানীয়দের মতে, সিঙ্গার বিলে ধরা পড়া এই বড় আকৃতির ব্লাক কার্প শুধু একটি মাছ নয়—বিলের হারিয়ে যাওয়া মৎস্যসম্পদ ফিরে আসারও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একসময় যে বিলে বড় মাছ পাওয়া অনেকটাই ভাগ্যের ব্যাপার ছিল, এখন সেই বিলে নিয়মিত উঠছে রুই, কাতলা, গ্রাস কার্প, ব্লাক কার্প, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। পাশাপাশি আইড়, চিতলসহ দেশীয় মাছের উপস্থিতিও বাড়ছে।স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগেও সিঙ্গার বিলের মৎস্যসম্পদের অবস্থা ভালো ছিল না। মাছের নিরাপদ বিচরণ ও প্রজননের সুযোগ কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে কমছিল বড় মাছের উপস্থিতি। পরিস্থিতি পরিবর্তনে মৎস্য বিভাগের উদ্যোগে বিলের নির্দিষ্ট এলাকায় গড়ে তোলা হয় মৎস্য অভয়াশ্রম। সেখানে মাছ ধরায় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তৈরি করা হয় নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। স্থাপন করা হয় বিল নার্সারি এবং বিভিন্ন সময়ে অবমুক্ত করা হয় পোনা মাছ।
এর ফলে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে সিঙ্গার বিলের চিত্র। অভয়াশ্রমে মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ পাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবৃদ্ধি বাড়ছে। একই সঙ্গে বিল নার্সারিতে মাছের বেড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় আশপাশের উন্মুক্ত জলাশয়েও মাছের বিচরণ বাড়ছে। এর সরাসরি সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষ।ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, সিঙ্গার বিলের আঙ্গারদোহায় মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে। নিয়মিত এর রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিল নার্সারি স্থাপন এবং বিভিন্ন সময়ে পোনা মাছ অবমুক্ত করার কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। পোনা অবমুক্তকরণ, অভয়াশ্রমের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও মা মাছ সংরক্ষণের ফলে বর্তমানে সিঙ্গার বিলে কার্পজাতীয় ও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য বাড়ছে।তিনি আরও বলেন, মা মাছ রক্ষা ও পোনা মাছ নিধন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, সিঙ্গার বিলে ২০ কেজির বেশি ওজনের ব্লাক কার্প ধরা পড়া নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর। এটি প্রমাণ করে, জলাশয়ে মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধার সম্ভব। অভয়াশ্রমে অবৈধভাবে মাছ ধরা, পোনা নিধন ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, সিঙ্গার বিলে বড় আকৃতির মাছের উপস্থিতি মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক ফলাফল। অভয়াশ্রমে মাছের নিরাপদ প্রজনন ও বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এর সুফল আশপাশের উন্মুক্ত জলাশয়েও ছড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অভয়াশ্রম রক্ষা, অবৈধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহার বন্ধ।
মন্তব্য করুন