বিএনটিভি ২৪,প্রতিবেদক :
সুদানের আবেই এলাকায় অবস্থিত জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষী হতাহত হইবার ঘটনা আমাদের বেদনাহত করিয়াছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্য উদ্ধৃত করিয়া সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানাইয়াছে, উক্ত হামলায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীগণের মধ্যে ৬ জন নিহত ও ৮ জন আহত হইয়াছেন।
হামলাকারীগণকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী বলা হইলেও জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে হামলার মধ্য দিয়া প্রমাণ হইয়াছে, তাহারা সন্ত্রাসী বৈ কিছু নহে। আর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশের মুখ উজ্জ্বল করিতে গিয়ে প্রাণহানির শিকার শান্তিরক্ষীগণ যেইভাবে শহীদ হইলেন, উহা বাংলাদেশের সহিত বিশ্ববাসীও কৃতজ্ঞতার সহিত স্মরণে রাখিবে।
আমরা নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। নিহত সেনাসদস্যদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রহিল আমাদের গভীর সমবেদনা এবং আহত সেনাসদস্যগণ দ্রুত সুস্থ হইয়া উঠুন– এই কামনা করি। ঘটনাটির পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই বক্তব্য যথার্থ– শহীদ শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের উজ্জ্বল ও গৌরবময় নিদর্শন হইয়া থাকিবে।
আমরা জানি, জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন আধুনিক বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। ইহার মাধ্যমে বিশেষত যুদ্ধবিধ্বস্ত বা সংঘাতপূর্ণ রাষ্ট্রে শান্তি স্থাপন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশ ১৯৮৮ সাল হইতে জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণাধীন এই শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করিয়া আসিতেছে এবং অতি অল্প সময়েই অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী রাষ্ট্ররূপে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি লাভ করিয়াছে। বর্তমানে এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে।
অদ্যাবধি বাংলাদেশ শান্তি রক্ষা মিশনে যত সম্মাননা পাইয়াছে, তাহা ভারত ও পাকিস্তানের প্রাপ্ত সম্মাননা অপেক্ষা অধিক। এই কারণে খোদ জাতিসংঘ মহাসচিব একাধিকবার বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন।
২০২২ সালে ডিআর কঙ্গোতে বাংলাদেশের নারী চিকিৎসক দলকে ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল কন্টিনজেন্ট’ হিসাবে পুরস্কৃত করিয়াছে জাতিসংঘ। সর্বোপরি বৈশ্বিক শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নির্ভরযোগ্যতা ও দ্রুত মোতায়েনযোগ্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা জাতিসংঘের সর্বাধিক পছন্দের বাহিনীরূপে পরিগণিত। তবে এই অনন্য অর্জনের নেপথ্যে যে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের দায়িত্ব পালনে অসাধারণ নিষ্ঠা; অসহায় মানুষদের জন্য শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকিবার বিষয় যুক্ত; উহাও বলিতে হইবে।
জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, ইতোপূর্বে কঙ্গো, মালি এবং দক্ষিণ সুদান মিশনে দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া দুর্ঘটনা, সন্ত্রাসী হামলা ও রোগাক্রান্ত হইয়া প্রায় ১৬০ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শহীদ হইয়াছেন। আহত হইয়াছেন উহার কয়েক গুণ, যাহাদের অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করিয়াছেন। তথাপি বাংলাদেশের সেনা বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্যগণ দেশে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক উদ্যোগে অংশগ্রহণে কুণ্ঠিত হন নাই। প্রসঙ্গত, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্যরূপে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণ, পুলিশ এবং বেসামরিক প্রশাসনের সদস্যগণও ভূমিকা রাখিবার সুযোগ পান।
আমরা মনে করি, আলোচ্য সন্ত্রাসী হামলায় হতাহত সেনাসদস্যগণের আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি শান্তিপ্রিয়, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর করিবে। শান্তিরক্ষীদের এই আত্মদানকে বাংলাদেশের জনগণ যে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দিবে পরম শ্রদ্ধায়– এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। স্মরণে রাখিতে হইবে, শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারীগণ একদিকে রেমিট্যান্স আয়ের মধ্য দিয়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতেছেন, অপরদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের কূটনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করিয়া চলিয়াছেন।
অত্যাধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি, অস্ত্র পরিচালনা, সামরিক যান ও সরঞ্জাম ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করিয়া প্রকারান্তরে তাহারা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করিতেছেন, ইহাও বলা বাহুল্য। আমরা আশাবাদী, জাতিসংঘ উক্ত হামলাকে শুধু যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য বলিয়াই ক্ষান্ত হইবে না; দ্রুত প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উহার পুনরাবৃত্তি প্রতিহতকরণে অধিকতর তৎপর হইবে।
মন্তব্য করুন